এনবিআর চালু
করল অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড: ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পেতে নতুন যুগের সুবিধা
বাংলাদেশে কর ব্যবস্থার
স্বচ্ছতা ও আধুনিকীকরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এক যুগান্তকারী
পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাট রিফান্ডের ক্ষেত্রে করদাতাদের যেসব
জটিলতা, সময়ক্ষেপণ এবং ঝামেলার মুখোমুখি হতে হতো, সেগুলো দূর করতে এবার সম্পূর্ণ অনলাইন ও অটোমেটেড ভ্যাট রিফান্ড
সিস্টেম চালু করা হয়েছে।
এই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে, এখন থেকে করদাতারা কোনো অফিসে দৌড়ঝাঁপ বা দালালের মাধ্যমে টাকার
ব্যবস্থা না করেই তাদের প্রাপ্য ভ্যাট রিফান্ড সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে
পেতে পারবেন। এই পোস্টে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব—কীভাবে সিস্টেম কাজ করবে,
করদাতাদের সুবিধা, ব্যাংকিং ইন্টিগ্রেশন,
রিফান্ড প্রক্রিয়ার ধাপ এবং প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন।
অনলাইন
ভ্যাট রিফান্ডের পটভূমি
বাংলাদেশে ভ্যাট রিফান্ডের
প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে পেপারভিত্তিক ছিল। করদাতারা প্রায়শই কর অফিসে
বারবার যেতে হতো, নথি জমা দিতে হতো এবং প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার
জন্য অনেক সময় অপেক্ষা করতে হতো। এছাড়া, প্রক্রিয়ার মধ্যে
অনিয়ম এবং দালাল ব্যবহার করদাতাদের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করত।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এই
দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে e-VAT প্ল্যাটফর্মে একটি অটোমেটেড অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড মডিউল যুক্ত করেছে। এর
মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটালাইজড, স্বচ্ছ এবং নির্ভুল
হয়েছে।
অনলাইন
ভ্যাট রিফান্ড কিভাবে কাজ করবে?
নতুন সিস্টেমের মূল
বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
1.
আবেদন
প্রক্রিয়া অনলাইনে: করদাতারা মাসিক VAT রিটার্ন
দাখিলের সময়ই অনলাইনে রিফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
2.
কাগজপত্র
জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই: প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা কাগজপত্র
অফিসে জমা দিতে হবে না।
3.
অনলাইন
যাচাই ও অনুমোদন: সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেট আবেদন যাচাই ও অনুমোদন
করবে।
4.
স্বয়ংক্রিয়
অর্থ স্থানান্তর: যাচাই শেষে প্রাপ্য ভ্যাট রিফান্ড
স্বয়ংক্রিয়ভাবে করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হবে।
5.
ট্র্যাকযোগ্যতা: আবেদন
থেকে শুরু করে অর্থ প্রাপ্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার ট্র্যাকিং অনলাইনে করা
সম্ভব।
এভাবে করদাতারা দূরবর্তী
স্থান থেকেও তাদের ভ্যাট রিফান্ড সহজে এবং ঝামেলাহীনভাবে পেতে পারবেন।
ব্যাংকে
টাকা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া
ভ্যাট রিফান্ড অনলাইনে সরাসরি
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠানোর জন্য এনবিআর বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ
করেছে:
- iBAS++ সিস্টেমের সংযুক্তি: এনবিআরের অর্থ বিভাগের iBAS++ (Integrated Budget
& Accounting System) এর সঙ্গে e-VAT প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করা হয়েছে।
- BEFTN ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ
স্থানান্তর: অর্থ স্থানান্তরের জন্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের BEFTN (Bangladesh Electronic Fund Transfer Network) ব্যবহার করা হবে।
- নিরাপদ ও নির্ভুল: সরকারি
হিসাব থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা দ্রুত, নিরাপদ
এবং নির্ভুলভাবে স্থানান্তরিত হবে।
আনুষ্ঠানিক
উদ্বোধন
ঢাকায় একটি আনুষ্ঠানিক
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান অনলাইন ভ্যাট
রিফান্ড প্রক্রিয়ার উদ্বোধন করেন।
- অনুষ্ঠানে ঢাকার তিনটি ভ্যাট কমিশনারেটের
আওতাধীন তিনজন করদাতার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪৫,৩৫,০০০ টাকা সরাসরি অনলাইনে প্রদান করা হয়।
- অনুষ্ঠানে করদাতাদের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন
গণমাধ্যমের সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।
এটি এনবিআরের জন্য একটি মাইলফলক
যা ভবিষ্যতে দেশের সব ভ্যাট কমিশনারেটে কার্যকর হবে।
করদাতাদের
জন্য সুবিধা
নতুন অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড
সিস্টেম চালু হওয়ার ফলে করদাতারা পাবেন অনেক সুবিধা:
1.
অফিসে
যাতায়াতের ঝামেলা নেই: কোনো ফাইল ধরাধরি বা ঘুষের ঝামেলা
থাকবে না।
2.
স্বচ্ছ
আবেদন প্রক্রিয়া: আবেদন সম্পূর্ণ অনলাইনে, ট্র্যাকযোগ্য এবং স্বচ্ছ।
3.
দ্রুত অর্থ
প্রাপ্তি: নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রাপ্য ভ্যাট
রিফান্ড।
4.
নিরাপদ
লেনদেন: ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর নিরাপদ।
5.
নগদ প্রবাহ
উন্নত: ব্যবসার জন্য Cash Flow সুবিধা।
6.
বিশ্বাসযোগ্যতা
বৃদ্ধি: সরকারি ব্যবস্থার প্রতি করদাতাদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
করদাতাদের
করণীয় ও নির্দেশিকা
যেহেতু পুরো প্রক্রিয়াটি
অনলাইন ও অটোমেটেড, তবুও করদাতাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ
নির্দেশিকা রয়েছে:
1.
মাসিক VAT রিটার্ন জমা দিন: রিটার্নের সঙ্গে রিফান্ড আবেদন জমা
দিন।
2.
ব্যাংক
অ্যাকাউন্ট যাচাই করুন: সঠিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার
করুন।
3.
ডকুমেন্টেশন
প্রস্তুত রাখুন: প্রয়োজন হলে ইলেকট্রনিক ফর্ম বা supporting
documents সংরক্ষণ করুন।
4.
আবেদন
ট্র্যাকিং করুন: অনলাইনে আবেদন স্ট্যাটাস পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
5.
সমস্যা হলে
যোগাযোগ করুন: কোন জটিলতা বা ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত সমস্যায় সংশ্লিষ্ট মূসক
কমিশনারেটের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
নতুন
সিস্টেমের প্রযুক্তিগত সুবিধা
- ডিজিটালাইজড সিস্টেম: e-VAT
প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণ অনলাইন ও অটোমেটেড।
- সঠিক হিসাব সংরক্ষণ: প্রশাসনিক ত্রুটি হ্রাস করা যায়।
- ডেটা অটোমেশন: ভ্যাট
লেনদেনের তথ্য সহজে বিশ্লেষণযোগ্য।
- স্বচ্ছতা: কারও
অনিয়ম করা কঠিন হবে।
- সুবিধাজনক: দূরবর্তী
স্থান থেকেও প্রক্রিয়া সম্পন্ন সম্ভব।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন ১: অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড কবে থেকে
কার্যকর হবে?
উত্তর: এনবিআরের নতুন সিস্টেম
ইতিমধ্যেই চালু, ধাপে ধাপে সব ভ্যাট কমিশনারেটে কার্যকর হবে।
প্রশ্ন ২: অনলাইনে রিফান্ডের জন্য কাগজপত্র
প্রয়োজন কি?
উত্তর: রিটার্ন জমার সময় প্রয়োজনীয় supporting
documents অনলাইনে আপলোড করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: কত সময়ে রিফান্ড ব্যাংকে জমা হবে?
উত্তর: যাচাই শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে
নির্ধারিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হবে।
প্রশ্ন ৪: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ঠিক না থাকলে কি
হবে?
উত্তর: রিফান্ড ব্যর্থ হবে এবং
সংশ্লিষ্ট কমিশনারেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
প্রশ্ন ৫: পুরানো পেপারভিত্তিক আবেদন অনলাইনে
স্থানান্তর করা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, পুরানো
রিটার্ন ডেটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করা হবে।
প্রশ্ন ৬: রিফান্ডে কোনো ফি বা চার্জ আছে কি?
উত্তর: না, এটি
সরকারের একটি সুবিধা, কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেই।
প্রশ্ন ৭: অনলাইন রিফান্ড প্রক্রিয়ায়
সমস্যার ক্ষেত্রে কার সাথে যোগাযোগ?
উত্তর: সংশ্লিষ্ট মূসক কমিশনারেটের
অফিসার।
প্রশ্ন ৮: রিফান্ডের আবেদন কতবার করা যাবে?
উত্তর: প্রত্যেক মাসের VAT রিটার্ন অনুযায়ী আবেদন করা যাবে।
প্রশ্ন ৯: কি কারণে রিফান্ড বাতিল হতে পারে?
উত্তর: ভুল তথ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ত্রুটি বা supporting documents অনুপস্থিতির
কারণে।
প্রশ্ন ১০: এই নতুন সিস্টেম করদাতাদের জন্য কেন
গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: সময় সাশ্রয়, স্বচ্ছতা, নিরাপদ লেনদেন, দ্রুত
অর্থ প্রাপ্তি এবং ব্যবসার নগদ প্রবাহ উন্নত।
উপসংহার: ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং স্মার্ট রাজস্ব ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এনবিআরের
অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড প্রক্রিয়া করদাতাদের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
- ব্যবসায়ীদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
- সরকারী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা
নিশ্চিত হবে।
- দেশের সমস্ত ভ্যাট কমিশনারেটে এটি কার্যকর
হলে, করদাতাদের এবং সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক আরও সহজ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থার
ডিজিটালাইজেশনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ যা ভবিষ্যতে ভ্যাট সংগ্রহ এবং
রিফান্ড প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নির্ভুল করার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অনলাইন ভ্যাট রিফান্ড, এনবিআর ভ্যাট সিস্টেম, e-VAT বাংলাদেশ, ভ্যাট রিফান্ড ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভ্যাট রিটার্ন অনলাইন, বাংলাদেশ করদাতাদের সুবিধা, ডিজিটাল ভ্যাট প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ ভ্যাট রিফান্ড, করদাতাদের জন্য নির্দেশিকা, ভ্যাট রিফান্ড ট্র্যাকিং, অনলাইন ভ্যাট আবেদন, iBAS++ ইন্টিগ্রেশন, BEFTN বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যবসায়ী বান্ধব কর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ কর ব্যবস্থা বাংলাদেশ
.png)
