ভূমিসেবায় অন্তর্বর্তী সরকারের ১০ যুগান্তকারী মাইলফলক প্রকাশ
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা
দীর্ঘদিন ধরেই জটিলতা, ধীরগতি এবং অনিয়মের অভিযোগে আলোচিত ছিল।
খতিয়ান সংগ্রহ, নামজারি (মিউটেশন), ভূমি
উন্নয়ন কর পরিশোধ কিংবা মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপেই সাধারণ মানুষকে বহুবার
অফিসে যেতে হতো। সময়, অর্থ ও মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে ভূমিসেবা
ছিল ভোগান্তির প্রতীক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক প্রশাসনিক
ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ফলে এই খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা
হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ভূমি খাতে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তুলে ধরা হয়েছে,
যা সেবা প্রাপ্তির পদ্ধতিকে আরও সহজ, স্বচ্ছ
এবং নাগরিককেন্দ্রিক করার লক্ষ্যেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
নীতিনির্ধারণী
পর্যায়ে অগ্রগতি তুলে ধরা
রাজধানীর সচিবালয়ে আয়োজিত এক
সংবাদ সম্মেলনে ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার সাম্প্রতিক সংস্কার
কার্যক্রমের সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র
সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ এবং খাদ্যসচিব মো. ফিরোজ সরকার। সংবাদ
সম্মেলনে জানানো হয়, গত কয়েক মাসে গৃহীত পদক্ষেপগুলো ভূমি
প্রশাসনকে কেবল দাপ্তরিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং
নাগরিকের দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করেছে।
এক
প্ল্যাটফর্মে সব সেবা: ডিজিটাল গেটওয়ের সূচনা
ভূমিসেবা প্রাপ্তির বিচ্ছিন্ন
প্রক্রিয়াকে একত্রিত করতে ২০২৫ সালের শুরুতে চালু করা হয়েছে land.gov.bd নামের কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এই পোর্টালের মাধ্যমে নাগরিকরা একটি
মাত্র অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর,
খতিয়ান যাচাই এবং মৌজা ম্যাপ সংগ্রহসহ বিভিন্ন সেবা নিতে পারছেন।
আগে প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা
আবেদনপত্র, আলাদা অফিস এবং আলাদা প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতো। এখন ডিজিটাল
ল্যান্ড সার্ভিস গেটওয়ের মাধ্যমে সেবাগুলো একই ছাতার নিচে আনা হয়েছে। ফলে সময় ও
প্রশাসনিক জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
ই-মিউটেশন
২.১: অনিয়ম রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার
ভূমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে
দীর্ঘদিন ধরে একই জমি একাধিকবার বিক্রির মতো জালিয়াতির ঘটনা ঘটত। এই অনিয়ম বন্ধে
ই-মিউটেশন ব্যবস্থার ২.১ সংস্করণ চালু করা হয়েছে। এখন জমি রেজিস্ট্রেশনের পর
স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট হোল্ডিং নম্বর তৈরি হচ্ছে।
এর ফলে তথ্য গোপন করে
প্রতারণার সুযোগ কমে গেছে। পাশাপাশি আবেদনকারীকে শুনানির জন্য একাধিকবার অফিসে
যেতে হচ্ছে না; নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় একবার উপস্থিত হলেই
অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা যেমন বেড়েছে, তেমনি নাগরিক হয়রানিও কমেছে।
কর
ব্যবস্থায় আধুনিকীকরণ
ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থায়
দ্বিতীয় পর্যায়ের আপডেটে যুক্ত হয়েছে ডুপ্লিকেশন চেক ও ই-পর্চা যাচাই সুবিধা। এখন
কোনো হোল্ডিং স্থগিত থাকলে তার কারণ অনলাইনে দেখা যাচ্ছে। আগে নাগরিকদের কারণ
জানতে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করতে হতো; এখন নিজের প্রোফাইল
থেকেই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া খতিয়ানের পূর্ণাঙ্গ
ইতিহাস সংরক্ষণ শুরু হওয়ায় মালিকানা যাচাই প্রক্রিয়া আরও নির্ভরযোগ্য হয়েছে।
ই-পোস্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই খতিয়ান সংগ্রহের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রবাসী বা দূরবর্তী এলাকার নাগরিকদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।
কর্মকর্তা
ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত
করতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোর সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের GEMS সিস্টেমের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কর্মকর্তা বদলি, পদায়ন ও ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল ও নজরদারির আওতায় এসেছে। এই
সমন্বয়ের ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দায়িত্ব পালনে
জবাবদিহির সংস্কৃতি জোরদার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
দেশব্যাপী
সহায়তা কেন্দ্র
ডিজিটাল সেবা চালু হলেও অনেক
নাগরিক প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। এ বাস্তবতা বিবেচনায় সারা দেশে ৮৮৯টি
ভূমিসেবা সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে
পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে অধিকাংশ জেলায় বিস্তৃত হয়েছে (তিন
পার্বত্য জেলা ছাড়া)। এসব কেন্দ্রে গিয়ে নাগরিকরা অনলাইনে আবেদন, ফি পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাইয়ের সহায়তা পাচ্ছেন। ফলে ডিজিটাল
বিভাজনের কারণে কেউ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না।
স্মার্টফোনে
ভূমিসেবা
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ
হিসেবে একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে
স্মার্টফোন ব্যবহার করেই ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, জিসিআর
সংগ্রহ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ ডাউনলোড করা যাচ্ছে। আগে এসব
কাজের জন্য সরাসরি অফিসে যেতে হতো বা কম্পিউটার ব্যবহারের প্রয়োজন হতো। এখন
মোবাইলভিত্তিক সেবার ফলে গ্রামীণ ও শহুরে উভয় এলাকার ব্যবহারকারীরা সহজে সেবা নিতে
পারছেন।
ডাটাবেজ
সংশোধনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ভূমি ডাটাবেজে দীর্ঘদিনের
ত্রুটি ও অসামঞ্জস্য দূর করতে UNDP–এর সহায়তায় তথ্য সংশোধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফেনী জেলা থেকে
পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি জেলায় সম্প্রসারিত
হয়েছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো পুরোনো ভুল তথ্য সংশোধন করে নির্ভুল ডিজিটাল
রেকর্ড তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে বিরোধ ও জটিলতা কমে আসে।
নতুন আইন ও
বিধিমালার প্রণয়ন
ভূমি দখল, জালিয়াতি ও কৃষিজমি রক্ষায় সরকার কয়েকটি নতুন আইন ও নির্দেশিকা প্রণয়ন
করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা
অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা ২০২৪। এসব
আইনি কাঠামোর মাধ্যমে ভূমি সংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ
তৈরি হয়েছে এবং কৃষিজমি অনিয়ন্ত্রিতভাবে রূপান্তরের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনার
চেষ্টা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক
প্রযুক্তি ও আধুনিক জরিপ
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমঝোতা
স্মারকের আওতায় ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাজধানীর
পূর্বাচল এলাকায় ‘পেন্টাগ্রাফ’ পদ্ধতি ব্যবহার করে লিজ দলিল সংক্রান্ত জটিলতা
নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ধরনের আধুনিক জরিপ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে জমির
পরিমাপ ও সীমানা নির্ধারণ আরও নির্ভুল হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিরোধ
কমাতে সহায়ক হবে।
কল সেন্টারে
ইতিবাচক সাড়া
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কল সেন্টার
১৬১২২–এর মাধ্যমে ২০২৫ সালে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ সেবা গ্রহণ করেছেন বলে জানানো
হয়েছে। নাগরিক সন্তুষ্টির হারও ৯০ শতাংশের বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। কল সেন্টার
ব্যবস্থার ফলে নাগরিকরা সরাসরি তথ্য ও পরামর্শ পাচ্ছেন, যা সেবার স্বচ্ছতা ও আস্থার মাত্রা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
উপসংহার: ভূমি
খাতে সাম্প্রতিক সংস্কারগুলো কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং নাগরিক অভিজ্ঞতায় বাস্তব প্রভাব ফেলছে—এমনটাই সরকারের দাবি। ডিজিটাল
প্ল্যাটফর্ম, আইনি শক্তিশালীকরণ, স্বচ্ছ
কর্মকর্তা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়ে ভূমিসেবা ধীরে ধীরে
হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের স্থায়িত্ব
নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, তথ্যের নির্ভুলতা
এবং নাগরিক সচেতনতার ওপর। যদি প্রযুক্তি, আইন এবং প্রশাসনিক
সদিচ্ছা একই গতিতে এগিয়ে চলে, তাহলে বাংলাদেশের ভূমি
ব্যবস্থাপনা সত্যিকার অর্থেই একটি আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য কাঠামোয় রূপান্তরিত হতে
পারে।
ভূমিসেবায় যুগান্তকারী পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১০ মাইলফলক, বাংলাদেশ ভূমি মন্ত্রণালয় সংস্কার, ভূমি মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সেবা, land.gov.bd অনলাইন সেবা, ই-মিউটেশন ২.১ আপডেট, অনলাইন নামজারি আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে পরিশোধ, খতিয়ান ডাউনলোড পদ্ধতি, মৌজা ম্যাপ অনলাইনে, ভূমি সেবা সহায়তা কেন্দ্র ৮৮৯টি, কল সেন্টার ১৬১২২ ভূমি সেবা, ভূমি ডাটাবেজ সংশোধন প্রকল্প, UNDP ভূমি প্রকল্প, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৬, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিধিমালা ২০২৪, ডিজিটাল ভূমি জরিপ বাংলাদেশ, দক্ষিণ কোরিয়া সমঝোতা স্মারক ভূমি, পূর্বাচল পেন্টাগ্রাফ পদ্ধতি, অনলাইনে হোল্ডিং নম্বর তৈরি, ভূমি জালিয়াতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্মার্টফোনে ভূমি কর পরিশোধ, ই-পর্চা যাচাই, ই-পোস্টে খতিয়ান প্রাপ্তি, বাংলাদেশ ভূমি প্রশাসন আধুনিকায়ন, ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, অনলাইন ভূমি গেটওয়ে বাংলাদেশ, নাগরিকবান্ধব ভূমি সেবা, ভূমি খাতে নতুন আইন ২০২৬, ডিজিটাল বাংলাদেশ ভূমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি ভূমি সংস্কার সংবাদ, ভূমি সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেট বাংলাদেশ।
.png)
