নিবন্ধিত
মোবাইল ফোনের ডি-রেজিস্ট্রেশন করবেন যেভাবে: এনইআইআর সিস্টেমের সম্পূর্ণ ও
হালনাগাদ নির্দেশিকা
বাংলাদেশে মোবাইল ফোন এখন
শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা,
শিক্ষা, ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল সেবার
অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ, অননুমোদিত ও
চোরাচালানকৃত মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারের কারণে টেলিযোগাযোগ খাতে নিরাপত্তা ঝুঁকি
তৈরি হচ্ছিল। এই সমস্যার সমাধানে সরকার এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন
(বিটিআরসি) চালু করেছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR)
বা এনইআইআর সিস্টেম।
এই সিস্টেমের মাধ্যমে দেশের
মোবাইল নেটওয়ার্কে কেবলমাত্র নিবন্ধিত ও বৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহারের
সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে মোবাইল ফোন কেনা, বিক্রি কিংবা
অন্যের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন কিছু নিয়ম ও দায়বদ্ধতা যুক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে নিবন্ধিত মোবাইল ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন বিষয়টি এখন অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ।
এই ব্লগ পোস্টে এনইআইআর কী, কেন ডি-রেজিস্ট্রেশন প্রয়োজন, কারা করবেন, কীভাবে করবেন, কী তথ্য লাগবে, কোন
ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা দরকার—সবকিছু ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা
হয়েছে।
এনইআইআর (NEIR) সিস্টেম কী এবং কেন এটি চালু করা হয়েছে
এনইআইআর হলো একটি জাতীয়
ডাটাবেজ, যেখানে দেশের সব বৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI)
নম্বর সংরক্ষিত থাকে। প্রতিটি মোবাইল
ফোনের একটি ইউনিক আইএমইআই নম্বর থাকে, যা দিয়ে সেই
ডিভাইসটিকে শনাক্ত করা যায়।
এনইআইআর চালুর মূল
উদ্দেশ্যগুলো হলো—
- অবৈধ ও চোরাচালানকৃত মোবাইল ফোনের ব্যবহার
বন্ধ করা
- ক্লোন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই শনাক্ত ও
নিয়ন্ত্রণ করা
- অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন
ট্র্যাক করা সহজ করা
- গ্রাহকের পরিচয় ও ডিভাইসের মধ্যে স্বচ্ছতা
নিশ্চিত করা
- টেলিযোগাযোগ খাতে জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার
করা
এই ব্যবস্থার ফলে এখন দেশে
নতুন বা ব্যবহৃত—সব মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে হলে তা অবশ্যই এনইআইআর সিস্টেমে
নিবন্ধিত থাকতে হবে।
ডি-রেজিস্ট্রেশন
কী এবং কেন এটি জরুরি
ডি-রেজিস্ট্রেশন বলতে
বোঝায়—কোনো মোবাইল হ্যান্ডসেটকে একজন গ্রাহকের এনআইডি ও সিমের সঙ্গে যুক্ত
নিবন্ধন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্ত করা।
এটি জরুরি কেন?
- আপনি যদি আপনার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বিক্রি
করতে চান
- কাউকে উপহার বা হস্তান্তর করতে চান
- পরিবার বা আত্মীয়ের কাছে স্থায়ীভাবে
ব্যবহার করার জন্য দিতে চান
তাহলে সেই ফোনটি আগে
ডি-রেজিস্ট্রেশন না করলে সেটি এখনও আপনার এনআইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ভবিষ্যতে
ফোনটি দিয়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বা অবৈধ কাজ হলে তার দায় আপনার ওপরও পড়তে পারে।
এছাড়া ডি-রেজিস্ট্রেশন ছাড়া
অন্য কেউ সেই ফোনে নিজের এনআইডি দিয়ে পুনরায় নিবন্ধন করতেও সমস্যায় পড়তে
পারেন।
ডি-রেজিস্ট্রেশনের
জন্য যেসব শর্ত অবশ্যই পূরণ করতে হবে
ডি-রেজিস্ট্রেশন করার আগে
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করতে হবে—
1.
যে সিম
দিয়ে ডি-রেজিস্ট্রেশন করবেন, সেটি আপনার নিজের এনআইডি
দিয়ে নিবন্ধিত হতে হবে
2.
আপনার
জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষ চারটি সংখ্যা জানা থাকতে হবে
3.
মোবাইল
ফোনটি অবশ্যই আগে এনইআইআর সিস্টেমে নিবন্ধিত থাকতে হবে
4.
ফোনটি যদি
ক্লোন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই সংক্রান্ত হয়, তাহলে অতিরিক্ত তথ্য
লাগতে পারে
নিবন্ধিত
মোবাইল ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন করার পদ্ধতি
বর্তমানে এনইআইআর সিস্টেমে
মোবাইল ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন করার জন্য দুটি সরকারি ও অনুমোদিত পদ্ধতি চালু রয়েছে।
পদ্ধতি ১:
এনইআইআর সিটিজেন পোর্টালের মাধ্যমে ডি-রেজিস্ট্রেশন
এটি সবচেয়ে বিস্তারিত ও
নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতি।
ধাপে ধাপে
করণীয়—
1.
ইন্টারনেট
ব্রাউজার খুলে এনইআইআর সিটিজেন পোর্টালে প্রবেশ করুন
2.
আপনার
এনআইডি ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে লগইন করুন
3.
ওটিপি যাচাই
সম্পন্ন করে ড্যাশবোর্ডে প্রবেশ করুন
4.
ড্যাশবোর্ডে
আপনার এনআইডির অধীনে নিবন্ধিত সব ডিভাইসের তালিকা দেখতে পাবেন
5.
যেই মোবাইল
ফোনটি ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে চান, সেটি নির্বাচন করুন
6.
“ডি-রেজিস্টার”
বা অনুরূপ অপশনে ক্লিক করুন
7.
প্রয়োজনীয়
তথ্য প্রদান করে আবেদন সাবমিট করুন
সফলভাবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন
হলে ফোনটি আপনার এনআইডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
পদ্ধতি ২:
ইউএসএসডি কোড ব্যবহার করে ডি-রেজিস্ট্রেশন
যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের
সুবিধা নেই, তাদের জন্য ইউএসএসডি পদ্ধতি সহজ ও কার্যকর।
ধাপে ধাপে
করণীয়—
1.
যে সিমটি
আপনার এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত, সেটি ফোনে ব্যবহার করুন
2.
ফোনের
ডায়াল অপশনে গিয়ে *১৬১৬১# ডায়াল করুন
3.
স্ক্রিনে
আসা মেনু থেকে ডি-রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করুন
4.
নির্দেশনা
অনুযায়ী এনআইডির শেষ চার ডিজিট প্রদান করুন
5.
প্রক্রিয়া
সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত নির্দেশনা অনুসরণ করুন
এই পদ্ধতিতেও ডি-রেজিস্ট্রেশন
সফল হলে একটি নিশ্চিতকরণ বার্তা পাওয়া যায়।
ক্লোন বা
ডুপ্লিকেট আইএমইআই থাকলে কী করবেন
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একাধিক মোবাইল ফোনে একই আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এই ধরনের ক্লোন
বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই ডিভাইসের ক্ষেত্রে ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে হলে অতিরিক্ত
সতর্কতা প্রয়োজন।
এমন ক্ষেত্রে—
- ডি-রেজিস্ট্রেশনের সময় পরবর্তী
ব্যবহারকারীর সিম নম্বর দিতে হতে পারে
- সঠিক তথ্য না দিলে আবেদন বাতিল হতে পারে
- ভবিষ্যতে নতুন ব্যবহারকারীর জন্য
রেজিস্ট্রেশন জটিল হয়ে উঠতে পারে
তাই এ ধরনের ফোন কেনাবেচার
ক্ষেত্রে সবসময় যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
ডি-রেজিস্ট্রেশন
না করলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে
ডি-রেজিস্ট্রেশন না করলে
সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো হলো—
- ফোনটি এখনও আপনার এনআইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে
- ভবিষ্যতে আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে
- নতুন ব্যবহারকারী নেটওয়ার্ক সমস্যায় পড়তে
পারেন
- এনইআইআর সিস্টেমে তথ্যের অসামঞ্জস্য তৈরি
হবে
তাই ফোন বিক্রি বা
হস্তান্তরের আগে ডি-রেজিস্ট্রেশন করা এখন আর ঐচ্ছিক নয়, বরং অত্যাবশ্যক।
সাধারণ
ব্যবহারকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
- ফোন বিক্রির আগে অবশ্যই ডি-রেজিস্ট্রেশন
সম্পন্ন করুন
- নিজের এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত সিম সবসময়
নিরাপদে রাখুন
- অপরিচিত ব্যক্তির অনুরোধে কখনোই
ডি-রেজিস্ট্রেশন করবেন না
- ব্যবহৃত ফোন কেনার সময় আগের মালিক
ডি-রেজিস্ট্রেশন করেছে কি না যাচাই করুন
প্রায়শই
জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১:
এনইআইআর ডি-রেজিস্ট্রেশন কি বাধ্যতামূলক?
উত্তর: হ্যাঁ। নিবন্ধিত
মোবাইল ফোন বিক্রি বা হস্তান্তরের আগে ডি-রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক।
প্রশ্ন ২:
অন্যের এনআইডি দিয়ে নিবন্ধিত সিম ব্যবহার করে ডি-রেজিস্ট্রেশন করা যাবে?
উত্তর: না। যে এনআইডি দিয়ে
ফোন নিবন্ধিত, সেই এনআইডির সিম ব্যবহার করতেই হবে।
প্রশ্ন ৩:
ডি-রেজিস্ট্রেশন করতে কোনো ফি লাগে কি?
উত্তর: না। বর্তমানে
ডি-রেজিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়।
প্রশ্ন ৪:
ফোন হারিয়ে গেলে ডি-রেজিস্ট্রেশন করা যাবে কি?
উত্তর: প্রয়োজন হলে সিটিজেন
পোর্টালের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে অতিরিক্ত যাচাই
লাগতে পারে।
প্রশ্ন ৫:
একাধিক ফোন একসাথে ডি-রেজিস্ট্রেশন করা যায়?
উত্তর: হ্যাঁ। পোর্টালে লগইন
করলে তালিকা থেকে একাধিক ডিভাইস নির্বাচন করা যায়।
প্রশ্ন ৬:
ইউএসএসডি পদ্ধতিতে কি সব ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন করা যায়?
উত্তর: সাধারণত যায়, তবে কিছু জটিল ক্ষেত্রে পোর্টাল ব্যবহার করা ভালো।
প্রশ্ন ৭:
ডি-রেজিস্ট্রেশন করলে ফোনটি কি বন্ধ হয়ে যাবে?
উত্তর: না। ফোনটি বন্ধ হয় না, শুধু আপনার এনআইডি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়।
প্রশ্ন ৮:
নতুন মালিক কীভাবে ফোনটি নিবন্ধন করবে?
উত্তর: নতুন মালিক নিজের
এনআইডি ও সিম দিয়ে এনইআইআর সিস্টেমে পুনরায় নিবন্ধন করবে।
প্রশ্ন ৯:
ক্লোন আইএমইআই ফোন কিনলে কী সমস্যা হতে পারে?
উত্তর: নেটওয়ার্ক ব্লক, নিবন্ধন জটিলতা ও আইনগত ঝুঁকি থাকতে পারে।
প্রশ্ন ১০:
ডি-রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত সমস্যায় কোথায় যোগাযোগ করবেন?
উত্তর: বিটিআরসি হেল্পলাইন বা
এনইআইআর সাপোর্ট চ্যানেলের মাধ্যমে সহায়তা নেওয়া যায়।
উপসংহার: এনইআইআর
সিস্টেম বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী
পদক্ষেপ। এর সঠিক বাস্তবায়ন শুধু অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধই নয়, বরং সাধারণ গ্রাহকের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। নিবন্ধিত মোবাইল
ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াটি জানা ও সঠিকভাবে অনুসরণ করা এখন সময়ের দাবি।
সচেতন ব্যবহারই পারে আপনাকে
ভবিষ্যতের ঝামেলা থেকে রক্ষা করতে।
নিবন্ধিত মোবাইল ফোন ডি-রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ডি-রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম, NEIR ডি-রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি, এনইআইআর সিস্টেম কী, neir.btrc.gov.bd ডি-রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ফোন বিক্রি করার আগে ডি-রেজিস্ট্রেশন, NID দিয়ে মোবাইল ডি-রেজিস্ট্রেশন, *16161# ডি-রেজিস্ট্রেশন কোড, IMEI ডি-রেজিস্ট্রেশন বাংলাদেশ, নিবন্ধিত ফোন বিক্রির নিয়ম, মোবাইল ফোন ট্রান্সফার করার নিয়ম, ব্যবহৃত মোবাইল ফোন কেনার আগে করণীয়, এনআইডি দিয়ে কতটি মোবাইল নিবন্ধিত, বিটিআরসি মোবাইল নিবন্ধন নিয়ম, ক্লোন আইএমইআই ডি-রেজিস্ট্রেশন, মোবাইল ফোন নিবন্ধন ও বাতিল প্রক্রিয়া, NEIR citizen portal guide, মোবাইল নিবন্ধন বাতিল করার নিয়ম বাংলাদেশ, মোবাইল ফোন আইন বাংলাদেশ, অবৈধ মোবাইল ফোন ব্লক নিয়ম
.png)
