বিয়ের পর
শারীরিক সম্পর্ক: ৭টি ভুল ধারণা যা ৯০% বাংলাদেশি দম্পতি বিশ্বাস করে
বিয়ে মানেই দুটো মানুষের
একসাথে পথ চলা। এই পথচলার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অথচ সবচেয়ে কম আলোচিত দিক হলো
শারীরিক সম্পর্ক। আমাদের দেশে সেক্স এডুকেশন মানে "বিয়ের পর সব এমনি বুঝে
যাবে"। ফলাফল হলো, নতুন দম্পতিরা বাসর রাত থেকে শুরু করে
বছরের পর বছর কিছু ভুল ধারণা বুকে নিয়ে সংসার করে। আর এই ভুল ধারণাগুলোই ধীরে
ধীরে দূরত্ব, হতাশা, এমনকি ডিভোর্স
পর্যন্ত ডেকে আনে।
চলুন দেখি, বাংলাদেশের ঘরে ঘরে কোন ৭টি মিথ সবচেয়ে বেশি চলে এবং সত্যিটা আসলে কী।
ভুল ধারণা
১: ফার্স্ট নাইটেই সব পারফেক্ট হতে হবে
প্রচলিত
বিশ্বাস: বাসর রাত
হলো সিনেমার মতো। ফুল, আলো, আর প্রথমবারেই
দুজনের "ম্যাজিক" হয়ে যাবে। না হলে সম্পর্কে সমস্যা আছে।
বাস্তবতা: বাংলাদেশের ৭০% এর বেশি নতুন দম্পতির
প্রথম শারীরিক সম্পর্ক ক্লান্তি, নার্ভাসনেস আর অজ্ঞতার কারণে
অস্বস্তিকর হয়। সারাদিনের বিয়ের ধকল, আত্মীয়দের ভিড়,
নতুন জায়গা, নতুন মানুষ। এরপর শরীর আর মন
কোনোটাই পারফরম্যান্স মুডে থাকে না।
কী করা
উচিত: প্রথম রাতে
কথা বলুন, হাত ধরুন, কমফোর্ট তৈরি করুন। শারীরিক
সম্পর্কের জন্য কোনো ডেডলাইন নেই। অনেক কাপল বিয়ের ৩ থেকে ৭ দিন পর প্রথমবার
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এটা একদম স্বাভাবিক। নিজেদের ওপর প্রেশার দেবেন না।
ভুল ধারণা
২: রক্তপাত না হওয়া মানে মেয়ে ভার্জিন না
প্রচলিত
বিশ্বাস: প্রথমবার
শারীরিক সম্পর্কে রক্তপাত হবেই। না হলে মেয়েটি আগে সম্পর্ক করেছে।
বাস্তবতা: এটা সবচেয়ে ভয়ংকর এবং ভুল মিথ।
মেডিকেল সায়েন্স বলে, হাইমেন বা সতীচ্ছদ একটি পাতলা পর্দা যা
সাইকেল চালানো, খেলাধুলা, নাচ, এমনকি হঠাৎ পড়ে গেলেও ছিঁড়ে যেতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,
প্রায় ৫০% মেয়ের প্রথমবার মিলনে কোনো রক্তপাতই হয় না। আবার কারও
হাইমেন এতটাই ইলাস্টিক যে বাচ্চা হওয়ার আগ পর্যন্ত অক্ষত থাকে।
কী করা
উচিত: এই ধারণা
থেকে বেরিয়ে আসুন। আপনার স্ত্রীর ভার্জিনিটি মাপার মেশিন আপনি না। বিশ্বাসটাই
একটা সম্পর্কের ভিত্তি। সন্দেহ নিয়ে সংসার শুরু করলে সেটা টেকে না।
ভুল ধারণা
৩: পুরুষের সবসময় রেডি থাকতে হবে, নইলে সে ‘পুরুষ’ না
প্রচলিত
বিশ্বাস: স্বামীর
ইচ্ছা হলেই স্ত্রীকে সাড়া দিতে হবে। আর স্বামীর নিজের ইচ্ছা ২৪ ঘণ্টা থাকতে হবে।
না থাকলে সে দুর্বল।
বাস্তবতা: পুরুষ কোনো রোবট না। স্ট্রেস, অফিসের চাপ, ঘুম কম হওয়া, ডায়াবেটিস,
থাইরয়েড, এমনকি জ্বরের কারণেও লিবিডো বা যৌন
ইচ্ছা কমে যেতে পারে। ৪০ বছরের পর টেস্টোস্টেরন হরমোন স্বাভাবিকভাবেই কমতে থাকে।
এটাকে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা অন্য শারীরিক সমস্যাও বলা যায় না সবসময়।
কী করা
উচিত: শারীরিক
সম্পর্ক পারফরম্যান্স শো না। এটা দুজনের সম্মতি আর ভালো লাগার বিষয়। কোনো একজনের
মন না চাইলে জোর করা বৈবাহিক ধর্ষণ। আর যদি নিয়মিত সমস্যা হয়, তাহলে লজ্জা না পেয়ে একজন ইউরোলজিস্ট বা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টের পরামর্শ
নিন।
ভুল ধারণা
৪: স্ত্রীর অর্গাজম জরুরি না, আসল কাজ তো বাচ্চা
প্রচলিত
বিশ্বাস: শারীরিক
সম্পর্কের মূল উদ্দেশ্য সন্তান উৎপাদন। মেয়েদের ভালো লাগা, ক্লাইম্যাক্স এগুলো "বিদেশি কালচার"।
বাস্তবতা: শারীরিক সম্পর্কের দুটো দিক আছে।
প্রজনন এবং ঘনিষ্ঠতা। একজন স্ত্রী যদি বছরের পর বছর শুধু স্বামীর চাহিদা মেটানোর
মেশিন হয়ে থাকেন, তাহলে তার মনে ক্ষোভ জমে। সেই ক্ষোভ
সংসারের অন্য সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণা বলে, যেসব
দম্পতির যৌন জীবন সন্তোষজনক, তাদের সামগ্রিক দাম্পত্য কলহ
৪০% কম হয়।
কী করা
উচিত: ফোরপ্লে, কমিউনিকেশন, স্ত্রীর কী ভালো লাগে সেটা জানতে
চাওয়া। লজ্জা ভেঙে কথা বলুন। মনে রাখবেন, সুখী স্ত্রী মানেই
সুখী সংসার।
ভুল ধারণা
৫: কনডম ব্যবহার করলে ‘আসল মজা’ পাওয়া যায় না
প্রচলিত
বিশ্বাস: কনডম পরলে
অনুভূতি কমে যায়। আর বিয়ের পর তো পিল আছে, কনডম কেন?
বাস্তবতা: প্রথমত, বিয়ের পরপরই বাচ্চা নেওয়ার প্ল্যান না থাকলে কনডম সবচেয়ে নিরাপদ
জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। এর কোনো সাইড ইফেক্ট নেই। পিল খেলে অনেক মেয়ের ওজন বাড়ে,
মাথা ঘোরে, হরমোনাল ইমব্যালান্স হয়।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক আল্ট্রা-থিন কনডমে অনুভূতির পার্থক্য ৫%
এরও কম। তৃতীয়ত, কনডম শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ না, এটা যৌনবাহিত রোগ থেকেও বাঁচায়।
কী করা
উচিত: বিয়ের পর
প্রথম ১ থেকে ২ বছর কনডম ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে দুজন দুজনকে বুঝতে সময়
পাবেন। বাচ্চা নেওয়ার সিদ্ধান্তটা প্ল্যান করে নিন। হঠাৎ প্রেগন্যান্সি দুজনের
ক্যারিয়ার ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর চাপ ফেলে।
ভুল ধারণা
৬: বিয়ের পর শারীরিক সম্পর্কের ফ্রিকোয়েন্সি কমে যাওয়াই স্বাভাবিক
প্রচলিত
বিশ্বাস: "বিয়ের ২ বছর পর আর ওসব থাকে নাকি। সংসার, বাচ্চা,
কাজের চাপে ওসবের সময় কই।"
বাস্তবতা: হ্যাঁ, হানিমুন ফেজ
সারাজীবন থাকে না। কিন্তু তাই বলে মাসে ১ বার বা ৬ মাসে ১ বার হওয়াটা স্বাভাবিক
না। ফ্রিকোয়েন্সি কমে যাওয়ার পেছনে কারণ থাকে। যোগাযোগের অভাব, শরীর নিয়ে হীনম্মন্যতা, মানসিক দূরত্ব, পর্ন আসক্তি, অথবা কোনো অজানা স্বাস্থ্য সমস্যা।
কী করা
উচিত: সপ্তাহে
কতবার হবে তার কোনো নিয়ম নেই। কোনো কাপলের জন্য সপ্তাহে ৩ বার স্বাভাবিক, কারও জন্য মাসে ৪ বার। জরুরি হলো দুজন যেন সেটিসফাইড থাকেন। যদি একজন চান,
আরেকজন মাসের পর মাস এড়িয়ে যান, তাহলে বসে
কথা বলুন। প্রয়োজনে কাপল কাউন্সেলিংয়ে যান।
ভুল ধারণা
৭: যৌন সমস্যা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে লোক জানাজানি হবে
প্রচলিত
বিশ্বাস: "এইসব জিনিস ডাক্তারকে বলা যায় নাকি। ফার্মেসির ওষুধ খেয়ে নিলেই তো
হয়।"
বাস্তবতা: এই লজ্জার কারণেই বাংলাদেশে হাজার
হাজার পুরুষ ভায়াগ্রা বা হারবাল ওষুধ খেয়ে কিডনি, লিভার নষ্ট
করছেন। আর মেয়েরা বছরের পর বছর ভ্যাজাইনাল ইনফেকশন, পেইনফুল
ইন্টারকোর্স নিয়ে ভুগছেন কিন্তু কাউকে বলছেন না।
কী করা
উচিত: যৌন
স্বাস্থ্য আপনার ডায়াবেটিস বা প্রেশারের মতোই একটা স্বাস্থ্য ইস্যু। সরকারি
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব বড় প্রাইভেট হাসপাতালে ‘স্কিন অ্যান্ড
ভিডি’ বা ইউরোলজি ডিপার্টমেন্ট আছে। ডাক্তাররা পেশাদার। আপনার তথ্য গোপন রাখা
তাদের দায়িত্ব। সমস্যা লুকিয়ে না রেখে চিকিৎসা নিন।
শেষ কথা: বিয়ে একটা জার্নি। আর শারীরিক
সম্পর্ক সেই জার্নির একটা গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। এই ভাষায় ভুল বোঝাবুঝি হলে পুরো
সংসারটাই দুর্বোধ্য হয়ে যায়। লজ্জা, ট্যাবু, আর "লোকে কী বলবে" এই তিনটা শব্দকে সাইডে রাখুন।
আপনার পার্টনার আপনার
প্রতিপক্ষ না, সে আপনার টিমমেট। টিমমেটের সাথে খোলাখুলি
কথা না বললে ম্যাচ জেতা যায় না।
যদি আপনার মনে হয় আপনাদের
সম্পর্কের কোনো দিক আপনাকে মানসিক বা শারীরিকভাবে কষ্ট দিচ্ছে, তাহলে একজন প্রফেশনাল কাউন্সেলর বা ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। সুস্থ থাকাটা
লজ্জার না, অসুস্থতা লুকিয়ে রাখাটা লজ্জার।
বিয়ের পর শারীরিক সম্পর্ক, বাসর রাতের ভুল ধারণা, ফার্স্ট নাইট টিপস বাংলাদেশ, রক্তপাত না হলে কি ভার্জিন না, হাইমেন নিয়ে ভুল ধারণা, স্বামীর যৌন ইচ্ছা কমে গেলে করণীয়, ইরেকটাইল ডিসফাংশন বাংলাদেশ, স্ত্রীর অর্গাজম কেন জরুরি, মেয়েদের ভালো লাগা যৌনতা, কনডম ব্যবহারের সুবিধা, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি বিবাহিতদের জন্য, বিয়ের পর যৌন ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায় কেন, দাম্পত্য কলহ ও যৌন জীবন, যৌন সমস্যায় কোন ডাক্তার দেখাবো, বৈবাহিক ধর্ষণ আইন বাংলাদেশ, সম্মতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক, পর্ন বনাম বাস্তব যৌনতা, নতুন দম্পতির যৌন শিক্ষা, স্বামী স্ত্রী শারীরিক সম্পর্ক নিয়ম, যৌন জীবন সুখী করার উপায়, সেক্স এডুকেশন বিবাহিত, শারীরিক সম্পর্কে ব্যথা হলে করণীয়, বাংলাদেশী দম্পতি যৌন সমস্যা, বাচ্চা নেওয়ার আগে প্রস্তুতি, যৌন স্বাস্থ্য টিপস, হানিমুন পিরিয়ড শেষ হলে কী করব, শারীরিক সম্পর্ক নিয়ে লজ্জা, ডাক্তার দেখাতে ভয় যৌন সমস্যা।
.png)
