নতুন বছরের
দোয়া: সুন্নাহ ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য
সময় মানুষের জীবনের এক অমূল্য নিয়ামত। ইসলাম সময়কে শুধু পার্থিব হিসাবের বিষয় হিসেবে দেখে না; বরং সময়কে ইবাদত, দায়িত্ব ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে। দিনের শুরু, মাসের শুরু কিংবা বছরের সূচনা—প্রতিটি সময়ই মুসলমানের জন্য আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার এক বিশেষ উপলক্ষ।
নতুন মাস ও
নতুন বছরের শুরুতে সাহাবায়ে কেরামের আমল
ইসলামের প্রাথমিক যুগে
সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সময়ের পরিবর্তনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে
গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে নতুন মাস বা নতুন বছর শুরু হলে তারা আল্লাহর কাছে কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ঈমানের দৃঢ়তা কামনা করতেন।
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ
ইবনে হিশাম (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, যখন সাহাবায়ে কেরাম
নতুন হিজরি মাস বা নতুন বছর পেতেন, তখন তারা একটি বিশেষ দোয়া
পাঠ করতেন। এই দোয়াটি সময়ের শুরুতে আল্লাহর সাহায্য ও হেফাজত কামনার এক অনন্য
দৃষ্টান্ত।
নতুন মাস ও
নতুন বছরের দোয়ার মূল আরবি পাঠ
اللَّهُمَّ أَدْخِلْهُ عَلَيْنَا بِالْأَمْنِ وَالْإِيمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْإِسْلَامِ وَرِضْوَانٍ مِنَ الرَّحْمَنِ وَجَوَارٍ مِنَ الشَّيْطَانِ
দোয়াটির
উচ্চারণ
আল্লাহুম্মা
আদখিলহু আলাইনা বিল-আমনি ওয়াল ইমানি ওয়াস সালামাতি ওয়াল ইসলামি ওয়া রিদওয়ানিম
মিনার রাহমানি ওয়া জাওয়ারিম মিনাশ শায়ত্বানি।
দোয়াটির
অর্থ (ভাবানুবাদ)
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ওপর
এই মাস বা বছরের আগমন ঘটান নিরাপত্তা ও শান্তির সাথে, ঈমান ও ইসলামের ওপর অবিচলতা সহকারে। আমাদেরকে দয়াময় আল্লাহর সন্তুষ্টি দান
করুন এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে আমাদের রক্ষা করুন।
(সূত্র: মু‘জামুস
সাহাবাহ, হাদিস নং ১৫৩৯)
দোয়াটির
গভীর তাৎপর্য ও শিক্ষা
এই সংক্ষিপ্ত দোয়াটির মধ্যে
একজন মুমিনের পার্থিব ও আখিরাতের প্রয়োজনীয় প্রায় সব কল্যাণের আবেদন অন্তর্ভুক্ত
রয়েছে।
১.
নিরাপত্তার দোয়া (الأمن)
এখানে জান-মাল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার কথা
অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলমান জানেন—আল্লাহর নিরাপত্তা ছাড়া কোনো নিরাপত্তাই স্থায়ী
নয়।
২. ঈমানের
স্থিতিশীলতা (الإيمان)
ঈমান শুধু থাকলেই যথেষ্ট নয়; জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে তা অটুট থাকা জরুরি। নতুন সময় মানেই নতুন
পরীক্ষা।
৩. শান্তি ও
সুস্থতা (السلامة)
শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার জন্য এই শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
৪. ইসলামের
ওপর অবিচলতা (الإسلام)
ইসলাম শুধু পরিচয় নয়; এটি জীবনব্যবস্থা। এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে পূর্ণ আনুগত্যের তাওফিক
চাওয়া হয়।
৫. আল্লাহর
সন্তুষ্টি (رضوان)
আল্লাহ সন্তুষ্ট হলে দুনিয়া ও
আখিরাত উভয়ই সফল হয়।
৬. শয়তান
থেকে সুরক্ষা (جوار من الشيطان)
শয়তান মানুষের প্রকাশ্য
শত্রু। তার কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি ছাড়া ঈমান রক্ষা সম্ভব নয়।
হিজরি
চন্দ্র ক্যালেন্ডার: ইসলামের সময়ব্যবস্থা
ইসলামে সময় গণনার ভিত্তি হলো
চাঁদের গতি। হিজরি ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে চন্দ্রনির্ভর।
কোরআনের
দলিল
আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন—
“তারা তোমাকে নতুন
চাঁদ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলো, এগুলো মানুষের জন্য এবং হজের
সময় নির্ধারণের মাধ্যম।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৮৯)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়, ইসলামে ইবাদতের সময়সূচি নির্ধারণে চন্দ্র ক্যালেন্ডার অপরিহার্য।
রাসুলুল্লাহ
(সা.) ও চন্দ্র ক্যালেন্ডার
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম নিজে চাঁদ দেখে মাস শুরু করতেন এবং সাহাবিদেরও তা করতে নির্দেশ দিতেন।
রমজান, শাওয়াল, জিলহজ—সব গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এই
ক্যালেন্ডারের ওপর নির্ভরশীল।
নতুন চাঁদ
দেখার সময় দোয়া ও আমল
নতুন চাঁদ দেখা সুন্নাহ। এই
সময় দোয়া করা মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম যে দোয়াটি পড়তেন, সেটিও এই সুন্নাহর অংশ।
বর্তমান
সময়ে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডার ও দোয়ার প্রাসঙ্গিকতা
আজকের বিশ্বে খ্রিষ্টীয় সৌর
ক্যালেন্ডার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, হিসাব—সবক্ষেত্রেই
এটি ব্যবহৃত হয়।
যেহেতু মুসলমানরাও দৈনন্দিন
জীবনে এই ক্যালেন্ডার ব্যবহার করেন, তাই খ্রিষ্টীয়
নতুন বছরের শুরুতেও এই দোয়াটি পড়লে শরিয়তসম্মত কোনো বাধা নেই। কারণ—
- দোয়াটি কোনো বিদআত নয়
- এতে কোনো হারাম বিষয় নেই
- এটি আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা
ইসলাম ভালো দোয়া ও কল্যাণ
কামনাকে নিরুৎসাহিত করে না।
নতুন বছর
উপলক্ষে একজন মুসলমানের করণীয়
নতুন বছর মানে শুধুই উৎসব নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মসংস্কারের সময়।
- বিগত সময়ের ভুলের জন্য তাওবা
- ভবিষ্যতের জন্য নেক নিয়তের সংকল্প
- ফরজ ও সুন্নাহ আমলে যত্নবান হওয়া
- সময়ের সদ্ব্যবহার
১০টি
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১:
এই দোয়াটি কি সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?
উত্তর: এটি সাহাবায়ে কেরামের
আমল হিসেবে বর্ণিত এবং গ্রহণযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ২:
নতুন বছর বলতে কি শুধু হিজরি বছর বোঝায়?
উত্তর: মূলত হিজরি বছর, তবে সাধারণ কল্যাণের উদ্দেশ্যে অন্য সময়েও পড়া যেতে পারে।
প্রশ্ন ৩:
খ্রিষ্টীয় নতুন বছরে দোয়াটি পড়া কি বিদআত?
উত্তর: না, এটি বিদআত নয়, কারণ এটি সাধারণ দোয়া।
প্রশ্ন ৪:
নারীরা কি এই দোয়া পড়তে পারেন?
উত্তর: অবশ্যই পারেন।
প্রশ্ন ৫:
একা পড়লে কি হবে?
উত্তর: একা বা
দলবদ্ধ—উভয়ভাবেই পড়া যায়।
প্রশ্ন ৬:
নতুন মাসের প্রথম দিনে কখন পড়া উত্তম?
উত্তর: চাঁদ দেখার সময় বা
মাসের শুরুতে।
প্রশ্ন ৭:
আরবিতে না পারলে বাংলায় দোয়া করা যাবে?
উত্তর: যাবে, তবে আরবি দোয়া উত্তম।
প্রশ্ন ৮:
এই দোয়ায় বছরের কথা আছে?
উত্তর: “হু” শব্দটি সময়ের
যেকোনো একক বোঝাতে পারে।
প্রশ্ন ৯:
শিশুদের শেখানো যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, এটি অত্যন্ত উপকারী দোয়া।
প্রশ্ন ১০:
নিয়মিত পড়লে কি বিশেষ ফজিলত আছে?
উত্তর: দোয়া কবুল আল্লাহর
ইচ্ছাধীন, তবে কল্যাণের আশা করা যায়।
উপসংহার: নতুন
মাস বা নতুন বছরের সূচনা মুসলমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক মুহূর্ত।
সাহাবায়ে কেরামের এই দোয়াটি আমাদের শেখায়—সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে আল্লাহর কাছে
সাহায্য, নিরাপত্তা ও ঈমানের দৃঢ়তা কামনা করা কতটা জরুরি।
হিজরি ক্যালেন্ডার ইসলামের
মৌলিক সময়ব্যবস্থা হলেও, আধুনিক বাস্তবতায় খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের
নতুন সময়েও এই দোয়াটি পাঠ করা একজন সচেতন মুসলমানের জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবহ আমল
হতে পারে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের
প্রত্যেকটি নতুন দিন, মাস ও বছর ঈমান, শান্তি
ও তাঁর সন্তুষ্টির সাথে অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নতুন মাসের দোয়া, নতুন বছরের দোয়া ইসলাম, হিজরি নতুন বছরের দোয়া, নতুন চাঁদ দেখার দোয়া বাংলা, সাহাবায়ে কেরামের দোয়া, ইসলামিক দোয়া বাংলা অর্থসহ, হিজরি ক্যালেন্ডার গুরুত্ব, চন্দ্র ক্যালেন্ডার ইসলাম, নতুন বছর শুরু করার দোয়া, ইসলামিক নতুন বছরের আমল, আরবি দোয়া বাংলা উচ্চারণ, দোয়া অর্থসহ বাংলা, ইসলামিক ব্লগ বাংলা, নতুন মাস শুরু করার দোয়া, ইসলামে সময়ের গুরুত্ব, কোরআন হাদিসে নতুন চাঁদ, সাহাবিদের আমল, ইসলামিক শিক্ষা বাংলা, নতুন বছর দোয়া অর্থ, হিজরি মাসের ফজিলত
.png)
