সহবাসে সঙ্গীর সাথে
ইচ্ছার অমিল হলে ৫টি মনোবৈজ্ঞানিক সমাধান
সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্মান সবই আছে। তবুও একটা জায়গায় এসে
দুজন মানুষ মিলতে পারছেন না — শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ইচ্ছা। একজন চাচ্ছে, আরেকজনের মুড নেই। একজন সপ্তাহে দুবার চায়, আরেকজনের
মাসে একবার হলেই যথেষ্ট মনে হয়। এই অমিলকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে "Desire
Discrepancy" বা ইচ্ছার পার্থক্য। আর এটা যতটা কমন, ততটাই স্পর্শকাতর।
গবেষণা বলছে, দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে থাকা ৮০% দম্পতির জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই
সমস্যা হয়। এটা কারও দোষ নয়। এটা অস্বাভাবিকও নয়। সমস্যা হয় তখনই, যখন এটা নিয়ে কথা না বলে দুজনই মনে মনে কষ্ট পুষে রাখেন, আর ধীরে ধীরে দূরত্ব তৈরি হয়। চলুন দেখি মনোবিজ্ঞানী ও কাপল থেরাপিস্টরা
এই ইচ্ছার অমিল মেটাতে কী ৫টি বিজ্ঞানসম্মত সমাধান দেন।
১.
"কার ইচ্ছা কম" সেই দোষারোপ বন্ধ করে "কেন" খুঁজুন
প্রথমেই মাথা থেকে বের করতে
হবে যে যার ইচ্ছা কম সে-ই "সমস্যা"। মানুষের লিবিডো বা যৌন আকাঙ্ক্ষা
একটা থার্মোস্ট্যাটের মতো না যে সবার একই লেভেলে সেট করা। এটা নির্ভর করে ঘুম, স্ট্রেস, হরমোন, শরীরের ওজন,
ওষুধ, বাচ্চা হওয়া, বয়স,
এমনকি ছোটবেলার শিক্ষা — অসংখ্য বিষয়ের উপর।
অনেক সময় যার ইচ্ছা কম, সে নিজেও অপরাধবোধে ভোগে। "আমি কেন পারছি না, আমার
সঙ্গী কি আমাকে ছেড়ে যাবে?" এই চাপ তার ইচ্ছা আরও
কমিয়ে দেয়। আবার যার ইচ্ছা বেশি, সে ভাবে "আমাকে কি
আর ভালো লাগে না?" ফলে অভিমান জমে।
মনোবিজ্ঞানীর
পরামর্শ: দুজন একসাথে
বসুন। খেলার ছলে একটা "ইচ্ছা কম-বেশির কারণ" লিস্ট বানান। যেমন: অফিসের
টেনশন, রাতে ৫ ঘণ্টার কম ঘুম, থাইরয়েডের
সমস্যা, বাচ্চা সামলানোর ক্লান্তি, পর্ন
দেখে অবাস্তব প্রত্যাশা। দেখবেন দোষটা কারও না, পরিস্থিতির।
কারণ জানলে সমাধান সহজ হয়।
২. "Responsive
Desire" বনাম "Spontaneous Desire" বোঝুন
আমরা সিনেমায় দেখি দুজন হঠাৎ
করে একে অপরকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে পড়ল। এটাকে বলে Spontaneous
Desire বা স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছা। পুরুষদের মধ্যে এটা বেশি কমন। কিন্তু
গবেষণা বলছে, বিশেষ করে নারীদের এবং দীর্ঘ সম্পর্কের
ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষের ইচ্ছা কাজ করে Responsive Desire মডেলে।
এর মানে হলো, মুড আগে থেকে থাকে না। আগে আদর, চুমু, গল্প, নিরাপদ স্পর্শ শুরু হয়। শরীর ও মন রিল্যাক্সড
হলে তারপর ধীরে ধীরে ইচ্ছা তৈরি হয়। যার ইচ্ছা কম, সে যদি
"মুডের অপেক্ষায়" বসে থাকে, তাহলে মুড আর আসবেই
না। আবার যার ইচ্ছা বেশি, সে যদি সঙ্গীকে সময় না দিয়ে
সরাসরি ঘনিষ্ঠতায় যেতে চায়, তাহলে সঙ্গী ভয় পেয়ে আরও
পিছিয়ে যাবে।
মনোবিজ্ঞানীর
পরামর্শ: "বিছানার বাইরে" ফোরপ্লে শুরু করুন। সারাদিনে ৬ সেকেন্ডের একটা
জড়িয়ে ধরা, পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া, প্রশংসা করা, কাজে সাহায্য করা — এগুলো Responsive
Desire ট্রিগার করে। লক্ষ্য ঘনিষ্ঠতা না, লক্ষ্য
সংযোগ। সংযোগ হলে ঘনিষ্ঠতা নিজেই আসবে।
৩.
"না" বলার অধিকার দিন, কিন্তু "কখনোই
না" ভেঙে দিন
যার ইচ্ছা কম, তার "না" বলার পূর্ণ অধিকার আছে। জোর করা, ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করা, রাগ দেখানো — এগুলো
সম্পর্কে বিষ ঢালে এবং ইচ্ছা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। কারণ মস্তিষ্ক তখন
ঘনিষ্ঠতাকে "চাপ" হিসেবে দেখে, "আনন্দ"
হিসেবে না।
তবে সমস্যা হয় যখন
"না" টা স্থায়ী "কখনোই না" হয়ে যায়। মাসের পর মাস কোনো
শারীরিক স্পর্শ নেই, কোনো চুমু নেই, কোনো
আলোচনা নেই। যার ইচ্ছা বেশি, সে তখন প্রত্যাখ্যাত বোধ করে,
আত্মবিশ্বাস হারায়।
মনোবিজ্ঞানীর
পরামর্শ: "স্যান্ডউইচ না" পদ্ধতি ব্যবহার করুন। ধরুন সঙ্গী আগ্রহ দেখাল,
আপনার মুড নেই। সরাসরি মুখের উপর "না" না বলে বলুন,
"তুমি আমাকে চাইছ এটা ভেবে আমার খুব ভালো লাগছে। আজ আমি খুব
ক্লান্ত, আজ না। কিন্তু কাল রাতে আমরা একসাথে মুভি দেখতে
পারি? শুধু দুজন।" এখানে আপনি ১. প্রশংসা করলেন,
২. না বললেন, ৩. বিকল্প ঘনিষ্ঠতার প্রস্তাব
দিলেন। এতে সঙ্গী বাতিল বোধ করবে না। আর যার ইচ্ছা বেশি, তার
কাজ হলো এই "না" টাকে ব্যক্তিগতভাবে না নেওয়া।
৪. শিডিউলড
ঘনিষ্ঠতা মানে রোমান্স মরে যাওয়া না
"ঘনিষ্ঠতা তো
স্বতঃস্ফূর্ত হবে, রুটিন করে হয় নাকি?" — এই ধারণা Desire Discrepancy-এর সবচেয়ে বড় শত্রু।
বাস্তবতা হলো, অফিস, বাচ্চা, বাজার, রান্না — এই রুটিনের ভিড়ে "মুড"
এর জন্য অপেক্ষা করলে মাস পার হয়ে যাবে।
সেক্স থেরাপিস্টরা বলেন, "Sex
is like exercise"। আপনি জিমে যাওয়ার মুডের অপেক্ষায়
থাকলে কখনোই যেতেন না। ক্যালেন্ডারে লিখে রাখেন বলেই যান। ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রেও একই
কথা।
মনোবিজ্ঞানীর
পরামর্শ: সপ্তাহে
একদিন "Intimacy Night" ঠিক করুন। এর মানে এই
না যে সেদিন শারীরিক মিলন হতেই হবে। এর মানে হলো, সেদিন রাতে
দুজন ফোন দূরে রাখবেন, বাচ্চা ঘুমালে দরজা লাগাবেন, একসাথে গোসল করবেন, ম্যাসাজ দেবেন, গল্প করবেন। মিলন হলে হলো, না হলে নাই। চাপ নেই। এই
"চাপমুক্ত" সময়টাই Responsive Desire-এর মানুষের
জন্য ম্যাজিকের মতো কাজ করে। কারণ সে জানে আজ তার "পারফর্ম" করতে হবে না,
শুধু কাছে থাকতে হবে।
৫.
ঘনিষ্ঠতার সংজ্ঞা শুধু "সহবাস" থেকে বড় করুন
ইচ্ছার অমিলের বড় কারণ হলো
আমরা ঘনিষ্ঠতা বলতে শুধু একটা কাজই বুঝি। যার ইচ্ছা কম, সে ভাবে "সঙ্গী কাছে আসা মানেই ওইটা চায়, আর
আমার এনার্জি নাই"। তাই সে জড়িয়ে ধরাও এড়িয়ে চলে। ফলে যার ইচ্ছা বেশি,
সে সব ধরনের স্পর্শ থেকেই বঞ্চিত হয়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ঘনিষ্ঠতার "মেনু" তৈরি করুন। মেনুতে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত অপশন
থাকবে। ১ মানে হলো ৫ মিনিট হাত ধরে বসা। ৩ মানে হলো জামা কাপড়সহ জড়িয়ে ধরে
শোয়া। ৫ মানে হলো চুমু। ১০ মানে হলো পূর্ণ সহবাস।
মনোবিজ্ঞানীর
পরামর্শ: প্রতিদিন
দুজন দুজনকে জিজ্ঞেস করুন, "আজ তুমি মেনুর কত নম্বর পর্যন্ত
কমফোর্টেবল?" হয়তো আজ কারও ২ নম্বর পর্যন্ত মুড আছে।
সেটাই করুন। কোনো জোর নেই, কোনো অপরাধবোধ নেই। এতে যার ইচ্ছা
কম সে নিরাপদ বোধ করে, আর যার ইচ্ছা বেশি সে অন্তত কিছুটা
স্পর্শ পায়। দেখবেন, ২ নম্বর করতে করতে মাসে কয়েকদিন ৮ বা
১০ নম্বরও এমনিই হয়ে যাচ্ছে।
শেষ কথা: ইচ্ছার অমিল মানে ভালোবাসার অমিল না। এটা শুধু দুটো আলাদা শরীরের আলাদা
ছন্দ। এই ছন্দ মেলানোর দায়িত্ব দুজনেরই। কথা বলুন, সহানুভূতি
দেখান, আর ছোট ছোট পরিবর্তন আনুন। যদি কয়েক মাস চেষ্টার
পরেও দূরত্ব কমে না আসে, বা এর সাথে তীব্র ঝগড়া, বিষণ্ণতা জড়িয়ে যায়, তাহলে একজন কাপল থেরাপিস্ট
বা সেক্সোলজিস্টের কাছে যেতে লজ্জা পাবেন না। এটা সর্দি-কাশির মতোই একটা সমস্যা,
যার চিকিৎসা আছে। মনে রাখবেন, সুস্থ সম্পর্কের
লক্ষ্য হলো দুজনই যেন জয়ী হয়। কেউ যেন ত্যাগ করতে নিঃশেষ না হয়, আবার কেউ যেন চাইতে চাইতে একা না হয়ে যায়।
বিশেষ
দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ সচেতনতার জন্য। হরমোনের সমস্যা, ডিপ্রেশন বা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে ইচ্ছা কমে গেলে অবশ্যই
রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
স্বামী স্ত্রীর ইচ্ছার অমিল, সঙ্গীর আগ্রহ কম কেন, বিয়ের পর সেক্স কমে গেছে, বউয়ের মুড থাকে না সমাধান, স্বামীর চাহিদা বেশি করণীয়, দাম্পত্য জীবনে শারীরিক দূরত্ব, Desire Discrepancy বাংলা, যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়ার কারণ, লিবিডো কমে গেলে কি করব, মেয়েদের ইচ্ছা কম কেন হয়, ছেলেদের চাহিদা বেশি হলে কি করা উচিত, Responsive Desire কি, Spontaneous Desire মানে কি, সঙ্গী না চাইলে করণীয়, জোর করে শারীরিক সম্পর্ক, বিয়ের পর রোমান্স নেই, দাম্পত্য কলহের সমাধান, সেক্স থেরাপি টিপস বাংলা, কাপল থেরাপিস্ট বাংলাদেশ, ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উপায়, শিডিউল সেক্স ভালো না খারাপ, না বলার অধিকার দাম্পত্য জীবনে, মানসিক কারণে ইচ্ছা কমে যাওয়া, স্ট্রেস ও যৌন জীবন, বাচ্চা হওয়ার পর ইচ্ছা কমে যাওয়া, সম্পর্ক বাঁচানোর উপায়, যৌন অতৃপ্তি সমাধান, দাম্পত্য সুখের টিপস, মনোবিজ্ঞানীদের পরামর্শ দাম্পত্য জীবন।
.png)
